আন্তঃমহাদেশের পথে : বার্লিন ফেস্টিভ্যাল

১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাস, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে টেলিফোনে জানানো হলো যে আমি যেন অবিলম্বে একাডেমীর মহাপরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফা নরূ-উল ইসলামের সাথে দেখা করি। সাক্ষাতেই তিনি এক গাল হেসে আমাকে বললেন, ”জার্মানি যাবে?” কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বললেন, ”বসো।” আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এরপরে তিনি কি বলবেন, সে জন্যে। তিনি বেশ সময় নিয়ে আমাকে বললেন, ”তোমাকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে পূর্ব জার্মানির বার্লিনে যাবার জন্য। ওখানে বার্লিন ফেস্টিভ্যালে তুমি যাবে।” শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো। আমি তখন ৩১ বছর বয়সের টগবগে তরুণ। এমন এক অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণে স্বভাবতই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। বার্লিন ফেস্টিভ্যালের নাট্যোৎসবের আমন্ত্রণে, আমি গিয়েছিলাম প্রতিনিধি হয়ে আর স্যার গিয়েছিলেন দলনেতা হিসেবে। ব্যস, আমরা দুজন।

নির্ধারিত দিনে একটা কেমন ভুতে-পাওয়া-মানুষের মতই ঢাকা এয়ারপোর্টে রওনা হলাম। বন্ধুবর আতাউর রহমান সাগ্রহে তাঁর গাড়িতে করে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়েছিল, আজও মনে আছে। বিমানবন্দরে মুস্তাফা নরূ-উল ইসলাম স্যার অপেক্ষা করছিলেন অনেকক্ষণ থেকেই। আমরা তৎকালীণ পূর্বজার্মানির এয়ারলাইন ’ইন্টারফ্লুগ’-এ ঢাকা থেকে তাসখন্দ হয়ে বার্লিন যাবো। ইন্টারফ্লুগের সেই বিমানে সবাই ছিল নারী। এদের প্রত্যেককেই দেখেছি ভীষণ উদগ্রীব থাকতে আমাদের ব্যাপারে। ঢাকা থেকে পূর্ব বার্লিন-এই ১৭ ঘন্টার ফ্লাইটে যাত্রীদেরকে ঘন ঘন খাবার কিংবা পানীয় পরিবেশন করা হতো তখন। তাসখন্দ বিমানবন্দরে নামলাম আমরা। এখানে যাত্রা বিরতি দেড় ঘন্টার। তাসখন্দে বিমানবন্দরের মূল ভবনটি বেশ পুরনো স্থাপত্যের নিদর্শন বলা যেতে পারে। ভেতরে ঢুকতেই গোল, চওড়া স্তম্ভের ওপরে উচুঁ ছাদওয়ালা এই ভবন পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বিমানবন্দরের রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেই আমি আর স্যার একটা চারকোণা টেবিলে স্থান করে নিলাম। ইন্টারফ্লুগের বিমানে এত খেয়েছি যে, খাবার ইচ্ছে ছিল না। অতএব, ফলের রস খেয়েই আমরা আবার বিমানে ওঠার জন্য তৈরি হলাম।

শোয়েনেফেল্ড পূর্ব বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ এর অন্তর্গত একটি অপেক্ষাকৃত ছোট বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরে বিকেল ৫টা নাগাদ আমাদের ইন্টারফ্লুগের ফ্লাইটটি অবতরণ করলো। প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে ইমিগ্রেশন এবং কাস্টম্স হয়ে বেরিয়ে আসতেই দেখলাম এক সুদর্শন নারী একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাতে আমাদের নাম লেখা। আমরা এগিয়ে যেতেই সহাস্যে আমাদের সাথে করমর্দন করলেন। কারেন্ রয়েডার, সেই সুন্দরী রমণী, ছিলেন আমাদের দোভাষী। কারেন সাথে করে একটি মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছিলেন। আমরা সবাই তাতে উঠে বসলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। শোয়েনেফেল্ড থেকে পূর্ব বার্লিনের মাঝখানে পৌঁছুতে আমাদের প্রায় এক ঘন্টার ওপরে লেগেছিল। অবশেষে বার্লিনের আলেক্জান্ডার প্লাৎজ-এ অবস্থিত ইন্টারহোটেল স্টাড বার্লিন-এর সামনে গিয়ে গাড়ি থামলো। হোটেল লবিতে ঢুকে দেখি এলাহী কান্ড। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লোক সমাগম ঘটেছে বার্লিন উৎসব উপলক্ষে।

পরদিন সকাল সাড়ে নয়টা। কারেন আমাদেরকে নিয়ে পূর্ব জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছুলো। যথারীতি শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। এইখানে নতুন একটি বাক্য শিখলাম, ’বাংলাদেশ-জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক’ যেটি প্রতিদিনই ব্যবহার করতে হয়েছে আমাকে, বিভিন্ন দপ্তরে। পরবর্তী সাক্ষাৎ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। এখানেও সেই ’এস লিবে বাংলাদেশ-ডিডিআর সলিডারিটেট’। প্রথমে আমাদেরকে একটি সভাকক্ষে বসিয়ে পূর্ব জার্মানির সংস্কৃতি এবং সংস্কৃতি-ঋগ্ধ সকল জায়গার ছবির বর্ণনা দিলেন এক সুন্দরী রমণী। বুঝতে পারলাম যে, পূর্ব জার্মানিতে থাকার সময়ে বার্লিন ছাড়াও সংস্কৃতিগত এবং ঐতিহাসিক মূল্যায়নে পূর্ব জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু শহর আমাদেরকে ঘোরানো হবে। যেমন ভাইমার, পট্স্ডাম, র্এফুর্ট, লাইপযিগ ইত্যাদি।

যে তিন/চার সপ্তাহ আমি পূর্ব জার্মানিতে ছিলাম, সেই সময় বিশ্বের কিছু প্রধান নাট্যমঞ্চে আমি নাটক দেখেছি, নাট্য কর্মশালায় যোগ দিয়েছি এবং প্রখ্যাত সব নাট্য নির্দেশকের সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এসবেরই শুরু বার্লিনের দ্বিতীয় সন্ধ্যায় স্টেট অপেরা হাউজে অপেরা দেখার অভিজ্ঞতা দিয়ে। এই সুবিশাল ভবনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজ-নাট্যশালা হিসেবে। সেটা ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে। এর প্রথম নামকরণ ছিল ’রয়েল অপেরা হাউজ’। পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় ’স্টেট অপেরা হাউজ’। ১৯৪৯ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত এই ইমারতটি সেই নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৭৪ সালে আমি যখন এখানে অপেরা দেখতে যাই তখন এর রবরবা অবস্থা। যেই নাট্যরীতি এঁরা তখন অনুসরণ করতেন তা ’বারোক্ থিয়েটার’ হিসেবে আজ পরিচিত। সেই সন্ধ্যায় বিশ্ববিখ্যাত প্রতীচ্যিও ধ্রæপদী সঙ্গীতজ্ঞ ভার্গ্না-এর কোন একটি অপেরা দেখেছিলাম বলে মনে পড়ছে। হলটির ধারণ ক্ষমতা ছিল ১৩০০। তিন স্তরে দর্শকদের বসবার জায়গা। কিন্তু আমি হলের প্রায় প্রতিটি কোণায় গিয়ে গিয়ে কন্ঠস্বর পরিষ্কার শুনতে পেয়েছি। ভাবতে অবাক লাগে যে, সেই সাড়ে তিনশ বছর আগের হল অথচ এর অ্যাকুস্টিক এত নিখুঁত!

’কম্যুনিস্টরা দিনরাত ধরে ধরে মানুষ খায়’ পশ্চিমাদের এই অপপ্রচার যে মিথ্যে, সেই বিষয়টি সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম পূর্ব জার্মানি ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে যেহেতু পুজিঁই সকল সম্পর্কের নিয়ামক নয়, সেহেতু মানবিক মূল্যবোধগুলোকে সেখানে উৎসাহ দেওয়া হয়ে থাকে। অবশ্য কম্যুনিস্টদের নিয়ে মুখরোচক চুটকি অহরহ শোনা যেত সেই কালে। যেমন: দুই বার্লিনের মাঝখানের দেয়ালের দুই পাশে কিছু তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিম বার্লিনে দাঁড়ানো তরুণেরা কলা খাচ্ছে। পূর্ব বার্লিনের তরুণেরা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো ’তোমরা কী খাচ্ছো?’ জবাবে ওরা বললো, ’আমরা কলা খাচ্ছি। তোমাদের ঐপারে কি কলা আছে?’ জবাবে পূর্ব বার্লিনের এরা বললো, ’না, আমাদের কলা নেই, তবে কম্যুনিজম আছে’। পশ্চিম বার্লিনীরা একটু বোকা হয়ে গেল। কিন্তু হেরে তো যেতে পারে না। তাই তারা জবাব দিল ’ঠিক আছে, কোন একদিন আমাদেরও কম্যুনিজম হবে।’ পূর্ব বার্লিনীরা হেসে বললো, ’সেই দিন তোমাদের কলা থাকবে না।

বার্লিনে আসার আগেই যখন বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম তখন বার্টল্ট ব্রেশ্ট-খ্যাত ’বার্লিনার অন্সম্ব্ল্’-এর বিষয়ে বিস্তর জেনেছি। ইচ্ছে ছিল বার্লিনে এসে এই বিখ্যাত থিয়েটারটি অবশ্যই দেখবো। এটির প্রতিষ্ঠাতা বার্টল্ট ব্রেশ্ট এবং তাঁর স্ত্রী হেলেনা ভাইগেল। ১৯৪৯-এ পূর্ব বার্লিনে তাঁরা এই থিয়েটারটি প্রতিষ্ঠিত করেন। এখান থেকেই বার্টল্ট ব্রেশ্ট এর মাদার কারেজ, ককেশান চক সার্কেল, লাইফ অব গ্যালিলিও ইত্যাদি নাটকের সফল মঞ্চায়ন করা হয়েছিল। তবে নাটক মঞ্চায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি ব্রেশট্ এখানে করেছিলেন, তা হলো তাঁর নাট্যরীতি, যা এপিক থিয়েটার নামে খ্যাতি লাভ করেছে, সেই রীতির চর্চা, অনুশীলন এবং তার আলোকে তরুণ অভিনেতাদেরকে প্রভাবিত করা।

বার্লিনে অবস্থিত ’ফোক্স ব্যূউনে’ থিয়েটারের প্রধান পরিচালক ছিলেন বেনেবেসোঁ । সহজে তাঁর সাক্ষাৎ মেলেনা। নেহায়েত রাষ্ট্রীয় অতিথি ছিলাম বলে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাক্ষাৎ পাবার। দেখা হবার পর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ’তাহলে তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছো?’ আমি একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কেননা পশ্চিমা বিশ্ব তখনও বাংলাদেশ সম্বন্ধে তেমন ধারনা রাখতো না। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন যে, ’তুমি বোধহয় জানো না পূর্ব জার্মানি হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় দেশ, যা বাংলাদেশকে তার স্বাধীনতার পর স্বীকৃতি দেয়।’ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথমেই তিনি আমাকে বলেছিলেন, ”তোমাদের সদ্য স্বাধীন দেশ, যেখানে কয়েক লক্ষ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের জন্য, সেখানে নাটকের প্রচলিত ধারাকে ভেঙে নতুন করে পথ চলা শুরু করো। এই কাজে তোমরা বার্টল্ট ব্রেশ্ট-এর নাট্যরীতি থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারো।” সেসময় আমি ব্রেশ্ট-এর অনূদিত এবং রূপান্তরকৃত নাটকের সাথে পরিচিত হয়েছি কলকাতার নাটক দেখে। বস্তুতপক্ষে বেনেবেসোঁর উৎসাহেই বাংলাদেশে ব্রেশ্ট নিয়ে আমার প্রথম কাজ, ’সৎ মানুষের খোঁজে’ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলাম আমি।
র্এফুর্ট জার্মানির একটি অতি প্রাচীন শহর। এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৭৪২ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের আলোচনায়। এই শহরে একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার প্রতিষ্ঠা ১৩৯২-তে। ধর্মযাজক মার্টিন লুথার, যিনি একজন ধর্মযাজক ছিলেন, পরে ঐ সম্প্রদায়ের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে প্রোটেস্টেন্ট রিফরমেশন করেছিলেন, তাঁর কর্মস্থল ছিল এই র্এফুর্ট। এখানকার ঐতিহাসিক গীর্জাটিতেই তিনি কাজ করতেন। এই শহরেই বাস করতেন শুদ্ধ সঙ্গীতের প্রখ্যাত শিল্পী জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ্-এর পূর্বপুরুষেরা। বেশ কিছু নামকরা জার্মান জাদুঘরও আছে এই শহরে। আমরা এই শহরে গিয়েছিলাম লাইপ্জিগ্ যাওয়ার পথে। বার্লিন থেকে খুব ভোরে রওনা হয়ে সকাল সকাল র্এফুর্টে এসেছিলাম। এখানে দিনভর ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যার ট্রেনে রওনা হলাম লাইপ্জিগের পথে।

লাইপ্জিগ্ একটি ব্যবসা প্রধান শহর হিসেবে পরিচিত সেই রোমান সা¤্রাজ্যের সময় থেকেই। পরবর্তীতে তৎকালীন পূর্ব জার্মানির অন্তর্গত এই শহরটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে। লাইপ্জিগ্রে বাণিজ্যমেলা এখন ইউরোপের একটি প্রধান বাণিজ্যমেলা হিসেবে মূল্যায়িত হয়। আমাদেরকে এইখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মূলত সংস্কৃতি প্রধান শহর হিসেবে এই শহরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। লাইপ্জিগ্ েএক রাত, এক দিন ছিলাম। জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ্ । প্রখ্যাত প্রতীচ্য-ধ্রæপদী সঙ্গীতজ্ঞ এই লাইপ্জিগ্ শহরে বসবাস করতে আসেন ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর প্রধান যে কাজগুলো, সেগুলো তিনি এইখানেই সম্পাদিত করেন, সেন্ট টমাস চার্চে। সেই সময় এখানকার বিভিন্ন গীর্জায় যে কয়্যার অর্কেস্ট্রা হতো, সেগুলো নির্মাণ এবং পর্যবেক্ষণ করার জন্য তাঁকে সঙ্গীত বিষয়ক পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাখ্ ভীষণ খরুচে লোক ছিলেন। পকেটে টাকাপয়সা প্রায় কখনোই থাকতো না। এই জন্য লাইপ্জিগ্ শহরের কেন্দ্রতে তাঁর যে ভাস্কর্য আছে, সেখানে রসিক ভাস্কর তাঁর কোটের পকেটটি বের করে নিয়ে এসে উদোম দেখিয়েছেন এটা বোঝাতে যে, তাঁর পকেটে কোন পয়সা নেই। বার্লিনের কাছেই ভাইর্মা ছোট্ট একটি শহর। অথচ এই শহরটিতে রয়েছে জার্মান সংস্কৃতির এক অফুরন্ত ভান্ডার। এখানে থাকতেন জার্মান মহাকবি গ্যেটে এবং নাট্যকার শির্লা । এ ছাড়াও নব্য স্থাপত্যকলার নিদর্শন বাউহাউস-এর প্রবর্তক ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস্-ও এই শহরেই এই বিশেষ স্থাপত্যকলার চর্চা শুরু করেন। ভাইমার্ েগিয়ে আমি এবং স্যার গ্যেটে এবং শির্লা -এর বড়ি দেখতে গিয়েছিলাম। এই বাড়িগুলোকে কেন্দ্র করে ধ্রæপদী সাহিত্যের চর্চায় শহরের মেধাবী তরুণেরা নিয়োজিত ছিল। গ্যেটে এবং শির্লা -এর বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ তাদের সম্পত্তিগুলোকে পরবর্তীতে সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করা হয়, যেখানে হাজার হাজার জার্মান প্রতিদিন বেড়াতে আসতেন।

শেষ দর্শনীয় স্থান জার্মান ন্যাশনাল থিয়েটার । এই থিয়েটারটি নব্য-জার্মান নাটকের চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছিল। এই থিয়েটারের সামনে গ্যেটে এবং শির্লা-এর স্মরণে তাদের দুজনের হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটি নজর কেড়েছিল। ন্যাশনাল থিয়েটারের তখনকার পরিচালক ছিলেন প্রখ্যাত নাট্য নির্দেশক ফ্রিৎস্ বেনেভিৎস্। তিনি ব্রেশ্টের নাটক নিয়ে বিশদ আলোচনা করলেন আমাদের সাথে এবং বললেন যে, ভারতে যাচ্ছেন শীগগিরই ব্রেশ্টের ওপরে কাজ করার জন্য। এর অনেক পরে, তিনি সাগ্রহে এসেছিলেন বাংলাদেশে, এখানকার নাট্যাভিনেতাদের সাথে ব্রেশ্টের নাটক ’লোক সমান লোক’ নিয়ে কাজ করতে। এই নাটকটিরও অতি সফল মঞ্চায়ন আমরা দেখেছি ঢাকার মঞ্চে। বস্তুতপক্ষে সেই ১৯৭৪-এ আমার মতো একজন অল্প বয়সী নাট্য নির্দেশক এবং অভিনেতার ইউরোপে নাট্যদর্শন, বলাই বাহুল্য, আমাকে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো আমার পরবর্তী জীবনে।

কলকাতা-কলকাতা

ধানশালিক, ঘুঘু, বুনো পায়রার দল কিংবা ডাহুকের ডাক আমার মনে এক ধরনের রোম্যান্টিসিজমের সৃষ্টি করতো অল্প বয়স থেকেই এবং তা ছিল অপ্রতিরোধ্য। তা সত্তে¡ও কলকাতার প্রতি একটা তীব্র আকর্ষণ আমার সবসময়ই ছিল।

আমরা যখন খুলনা কিংবা কুষ্টিয়ায় থাকতাম, কলকাতা ছিল প্রায় পাশের শহর। অতএব গ্রীষ্মের ছুটির প্রায় দু’মাস আগ থেকেই আমরা লম্বা সময়ের জন্য কলকাতা যাবার প্রস্তুতি নিতাম। কলকাতার প্রতি বহুবিধ আকর্ষণ ছিল আমাদের। এর প্রধানতম কারণ ছিল নাগরিক জৌলুস। শেয়ালদহ স্টেশনে নেমেই এই জৌলুস টের পাওয়া যেতো। হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে করে আসছে যাচ্ছে। বাইরে হাতে টানা রিক্সা, ঘোড়ার গাড়ি কিংবা ট্যাক্সি অপেক্ষমাণ। স্টেশন ছাড়িয়ে রাস্তায় পড়লেই ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দ। ততদিনে কলকাতায় দোতলা বাস চালু হয়ে গেছে। সেটিও একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল আমাদের কাছে। স্কুলে পড়ার সময় আমার খুবই প্রিয় একটি বাংলা ব্যাকরণ এবং রচনার বই ছিল, নাম ’একের ভেতরে চার’। তৎকালীন সিটি কলেজের বাংলার অধ্যাপক বিনয় সরকার বইটি রচনা করেছিলেন। এই বইয়ে একটি রচনা ছিল ’ভোরের প্রথম ট্রাম এবং রাতের শেষ বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা’। ঐ বয়সে কলকাতাকে এমনই ভালবাসতাম যে, এই রচনাটি আমার প্রায় কয়েক ’শ বার পড়া হয়ে গিয়েছিল।

রচনাটি ছিল ভারি সুন্দর। মনে পড়ে এখনও এর বর্ণনা ঃ কোন শীতের সকালে ট্রাম চলেছে বালিগঞ্জ থেকে হাওড়া স্টেশনের পথে। তখনও কলকাতা শহর সম্পূর্ণ জেগে ওঠেনি। তবে কিছু কিছু প্রাণের সঞ্চার শুরু হয়েছে রাস্তাঘাটে। হকার ছুটেছে সাইকেলে করে খবরের কাগজ নিয়ে। রাস্তার ধারে ফুটপাতের ওপর হাইড্রান্টের মুখ খোলা। অবিরত পানি বেরুচ্ছে। যে পানিতে কলকাতার রাস্তা ধোয়া হয় আবার সেই পানিতেই ভোরের কলকাতায় রিকশাওয়ালা কিংবা মুটে মজুরেরা তাদের ¯œান সেরে নেয়। গয়লা তার দুধের ভাঁড় কাঁধে চড়িয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে দুধ বিক্রির জন্য। দু-একটি দোকনের সামনের দরজা খোলা। চায়ের জন্য দুধ চড়ানো হয়েছে এবং কেটলীতে পানি ও চা। কয়লার চুলায় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে দোকানদার। ঘুমন্ত কলকাতা আস্তে আস্তে জেগে উঠছে। যেই ব্যক্তির এই অভিজ্ঞতা তিনিই আবার রাতের শেষ বাসে ফিরছেন হাওড়া স্টেশন থেকে বালীগঞ্জে তাঁর বাসায়। এও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। কলকাতা শহর অনেক রাত অবধি জেগে থাকে। আলোয় ঝলমল চারপাশ। দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে একে একে । এখানেও কলকাতার রাত্রি সম্বন্ধে অতি সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায়।
আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন ভাবে কলকাতায় যেতাম। খুলনায় যখন ছিলাম তখন ট্রেনে করে বেনাপোল-বনগাঁ হয়ে, কুষ্টিয়ায় থাকতে দর্শনা-বানপুর হয়ে এবং ঢাকায় যখন ছিলাম তখন নারায়নগঞ্জ থেকে কয়লা চালিত বড় স্টিমারে গোয়ালন্দ, তারপর সেখান থেকে রেলগাড়িতে সেই দর্শনা-বানপুর হয়ে কলকাতা। এই শেষের যাত্রাটি আমাদের সকলের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। দুপুর বেলা নারায়নগঞ্জ থেকে স্টিমার ছাড়তো। আমরা স্টিমারে এগিয়ে চলতাম গোয়ালন্দের দিকে। স্টিমারের প্রথম শ্রেনির খাবারের ঘরকে ’সেলুন’ বলা হতো। সেখানে বসে ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে গরম ভাতের স্বাদ ছিল অমৃতের মতো। স্টিমারের খাওয়া আমাদের জন্য সবসময় অত্যন্ত লোভনীয় ছিল। প্রথমবার আমরা, স্মোকড হিলসা ঐ স্টিমারেই খেয়েছি। এছাড়া একটি বিশেষ পদ, যাকে বলা হতো গøাসি, সেও ঐ স্টিমারেরই অবদান। এটি মুরগী দিয়ে রান্না করা হতো। রোস্টের চেয়ে আরেকটু বেশি লাল রঙা, ভেজা ভেজা রান্না, আবার ঠিক ঝোলও না। ঝালের বিন্দু বিসর্গও ছিল না। কাঁটা ছুরি দিয়ে এক টুকরো মুখের ভেতরে দিলে সাথে সাথে মিশে যেতো। সারারাত স্টিমারের কেবিনে ঘুমাতাম। ভোর হলে পৌঁছতাম গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ ঘাটের ওপরে স্টেশনে দাঁড়ানো ঢাকা মেইল ট্রেনে গিয়ে উঠতাম। স্টেশনেই হাত-মুখ ধোয়া হতো। তারপর নাশতার আয়োজন। তখন ঢাকা মেইল-এ একটা ক্যান্টিন থাকতো, যাকে বলা হতো ’রানিং রুম’। সাদা পোশাক আর মাথায় পাগড়ি পরে খাবার পরিবেশকরা কামরায় কামরায় গিয়ে জিজ্ঞেস করতো কে কী খেতে চায়। এদেরকে ডাকা হতো ’বয়’ বলে। ঐ সময় ট্রেনের উঁচু ক্লাসে ’ইংলিশ ব্রেকফাস্ট’ বলে এক নাশতা পাওয়া যেতো। ডিম ভাজা, কাটলেট আর রুটি-মাখন। বড় উপাদেয় ছিল সকালের সেই নাশতা। ঐ পথে সবচেয়ে বিরক্ত লাগতো দর্শনা আর গেদে স্টেশনে। এই দুই স্টেশনে ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস্ ট্রেন দাঁড় করিয়ে অনেকক্ষণ ধরে যাত্রীদের পাসপোর্ট আর মালামাল পরীক্ষা করতো। প্রায় তিন ঘন্টা পর ট্রেনকে চলতে দেয়া হতো। বড় বিরক্তিকর মনে হতো ওই দীর্ঘ সময়টাকে।

ট্রেন বর্ডার পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করা মাত্র পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতো সর্বত্র। পথের খাবার, যাকে ইংরেজিতে স্ট্রিট ফুড বলে, তার প্রাচুর্য এবং রকমভেদ দেখা যেতো সর্বত্র। বিশেষ করে ট্রেন স্টেশনগুলোতে। এই সব খাবারের মধ্যে আমাদের বিশেষ প্রিয় ছিল বিভিন্ন ধরনের সিঙ্গাড়া। আমাদের পূর্ববঙ্গে তখন কেবল আলুর সিঙ্গাড়াই পাওয়া যেতো কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ছোট ছোট শহরগুলোতেও নানা ধরনের সিঙ্গাড়া পাওয়া যেতো। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ফুলকপি আর মটরশুটির সিঙ্গাড়া। ঐ সিঙ্গাড়ার স্বাদ এখনও আমার জিভে লেগে আছে। সিঙ্গাড়ার জন্য গোটা পশ্চিমবঙ্গই সব সময় বিখ্যাত ছিল। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে যেতে গঙ্গার ধারে একটি স্টেশনের নাম কোলাঘাট। এখানে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যেতো। এছাড়াও পাওয়া যেতো অতি ছোট ছোট সুস্বাদু সিঙ্গাড়া। নানারকম তরকারির পুর দিয়ে তৈরি এবং ঝালে ভরপুর। লোকে ঠাট্টা করে বলতো কোলাঘাটের যে কোন মিষ্টির দোকানে গিয়ে সিঙ্গাড়া চাইলে পরে প্রতিটা সিঙ্গাড়ার সাথে একটি অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট দোকানদার বিনা পয়সায় দিতো। কলকাতা শহরেও অল্প পয়সায় অতি সুস্বাদু খাবার পাওয়া যেতো। কিছু কিছু এলাকা , যেখানে মূলত মুসলমানদের বাস, সেই সব জায়গায় অনেক কাবাবের দোকান ছিল, এখনও আছে। ঐ সময় ’নিজাম-রোল’ প্রায় বিশ্ববিখ্যাত ছিল। অবশেষে কলকাতায় পৌঁছতাম আমরা। তখন প্রায় সন্ধ্যা-রাত। চারিদিকে আলো ঝলমল করতো। হাজার হাজার যাত্রীর আনাগোনা শেয়ালদহ স্টেশনে। কলকাতায় আসার উত্তেজনায় ভ্রমণের ক্লান্তি ভুলে যেতাম সবাই। বাল্যকাল থেকে এই সকল অভিজ্ঞতালব্ধ সুখস্মৃতি, এই পরিণত বয়সেও কলকাতার প্রতি আমাকে অবিরত আকর্ষণ করে যায়।

অতঃপর আগ্রা

আমার মায়ের একটা অভ্যাস ছিল প্রায় প্রতি বছর ভারতের বিভিন্ন মাজার শরীফে ঘুরে বেড়ানো। এইসব সফরে আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে কেউ না কেউ তাঁর সঙ্গী হতো। আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, মায়ের সাথে আমি এবং আমার তিন ভাইবোন, আমরা সবাই দিল্লী এবং আজমীর শরীফ গিয়েছিলাম। সেই সুবাদে আগ্রায় তাজমহল দেখেছিলাম তখন। এটি ছিল পূর্ববঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আমার প্রথম ভ্রমণ।

আজমীর থেকে এক বিকেলে আমরা রওনা হলাম আগ্রায়। পথে মথুরা সড়কের পাশে মোঘল স¤্রাট আকবরের কবর দেখার পরিকল্পনা আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল। এটি মোঘল স্থাপত্যের এক সুচারু নিদর্শন। আকবর স¦য়ং তার জীবদ্দশায়, ষোড়শ খ্রীস্টাব্দে এর নির্মাণ শুরু করেন। এই ইমারতটি ভারি সুন্দর একটি স্থাপত্য এবং যাঁরাই আগ্রায় যান, তাঁরা এখানেও আসেন একবার। আমরা আজমীর থেকে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে আগ্রায় যাচ্ছিলাম।

অবশেষে আগ্রা এসে পৌঁছলাম। ধুলোমলিন একটা শহর। অনেকটা আমাদের মফস্বল শহরের মতোই। মনটা দমে গেলো। এত শুনেছি এই ইতিহাস বিখ্যাত শহরের কথা অথচ এই তার চেহারা? পরদিন সকালে নাশতার পর ৯টার মধ্যে আমরা সবাই তৈরি। তাজমহল দেখতে যাওয়া হবে। আমরা টাঙ্গায় চড়ে তাজমহলের কাছে পৌঁছলাম। একটু হেঁটেই প্রধান ফটক। এই ফটক পেরুলেই তাজমহল। হঠাৎ দিদি আমাদের তিন ভাই বোন কে বললেন, তোমরা হাত ধরাধরি করে চোখ বন্ধ কর। একবারে ফটকের গোড়ায় আমরা হাতে হাত ধরে চোখ বন্ধ করলাম। দিদি ভাইয়ার হাত ধরে ফটক পার হয়ে ভেতরে ঢুকলো। আমরা সবাই রেলগাড়ির মতো একে অন্যের হাত ধরে-অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকলাম। আমাদের চোখ বন্ধ। এবারে দিদি বললেন-চোখ খোল, তবে আস্তে আস্তে। আমরা ধীরে ধীরে চোখ খুললাম। সকলের কন্ঠ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল একই শব্দ, বাহ! তাজমহল প্রথম ধাক্কাতেই আমাদেরকে আছাড় মারলো। কী এক অসাধারণ সুন্দর ইমারত! একবার তাকালে চোখের পলক ফেলাও দুঃসাধ্য । মোঘল স্থাপত্যের উজ্জ্বলতম নিদর্শন হিসেবে তাজমহল নির্মাণ করতে ২১ বছর (১৬৩২ খ্রীস্টাব্দ-১৬৫৩ খ্রীস্টাব্দ) সময় লেগেছে। কয়েক হাজার নির্মাতা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এই ইমারতকে দাঁড় করাতে। এর প্রধান নকশা তৈরি করেছিলেন স্থপতি, ওস্তাদ আহমেদ লাহোরী। বাদশাহ্ সাজাহান এর তত্ত¡াবধানে এই ইমারত নির্মিত হয়।

”যদি কোন অপরাধী আশ্রয় চায় এই ইমারতে,
ক্ষমা হবে তার সব অপরাধ!
যদি কোন পাপী অনুতপ্ত হৃদয়ে এইখানে আসে,
তবে ধুয়ে যাবে তার পাপ যত আছে!
এই ইমারত দর্শনে সৃষ্টি হয় নব নব দুঃখগাথা।
অশ্রæ ঝরে অবারিত ধারায় সূর্য এবং চাঁদের চোখ থেকে।
এ ধরায় এই বিস্ময়ের নির্মাণ, নির্মাতার গৌরব-গাথা করবে প্রদর্শন আজীবন।”

এইটা একটি পুরনো কবিতার অংশ বিশেষ, যা লোকের মুখে মুখে ঘোরে এই ইমারতকে ঘিরে। তাজমহলের আকর্ষণস্পৃষ্ট হয়ে ৪/৫ ঘন্টা কোথা দিয়ে কেটে গেলো বুঝতে পারলাম না আমরা।

দুপুরের খাবার খাওয়ার পর তাজমহল সংলগ্ন একটি উদ্যানে আমরা ঘন্টাখানেক গল্পগুজব করলাম। তারপর দিদি বললেন, আমাদের এবারে লাল কেল্লা দেখতে যেতে হবে। তাজমহল দেখবার পর আর কিছু দেখতে ভালো লাগবে বলে মনে করিনি। তবুও টাঙ্গায় করে লাল কেল্লায় এসে পৌঁছলাম। হাঁটতে হাঁটতে ওপর দিকে উঠতে লাগলাম এবং ইতিহাসখ্যাত বিভিন্ন প্রকোষ্ঠের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটল। সিঁড়ির ধারে একটি অন্ধকার ঘর দেখতে পেলাম, যার দরজা জেলখানার মতন। আমাদের গাইড বললেন, এই ছোট্ট প্রকোষ্ঠটিতে আওরঙ্গজেব বাদশাহ্ সাজাহানকে বন্দি করে রেখেছিলেন। দেখলাম দিওয়ানে আম এবং দিওয়ানে খাস। তারপর গেলাম লাল কেল্লার একবারে শীর্ষে অবস্থিত একটি সুন্দর ব্যালকনিতে। চারিদিকে ফিলিগ্রির কাজ করা রেলিং। রোগাক্রান্ত, বৃদ্ধ বাদশাহ্ সাজাহান তাঁর শেষ বয়সে এই ব্যালকনিতে শুয়ে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন। এখানেই তিনি থাকতেন দিনের বেশিরভাগ সময়। এই ব্যালকনি থেকে তাজমহল দেখা যেতো। তিনি শুয়ে শুয়ে দেখতেন তাঁর প্রিয় তাজমহলকে দিনের বিভিন্ন সময়ে। শ্বেতপাথরে নির্মিত তাজমহল দিনের বিভিন্ন সময়ে তার চেহারা বদলায়। সূর্যাস্তের ঠিক আগে অস্তগামী সূর্যের লাল আলোয় তাজমহলের সৌন্দর্য অসাধারণ! এই ব্যালকনি থেকে যমুনা নদী এবং তার পাড়ে গোধূলির আলোয় কমলা রঙের তাজমহল দেখতে অপূর্ব লেগেছিল। এর পরে আমি যত বার আগ্রায় গেছি, এই বিশেষ সময়ে, অর্থাৎ গোধূলিতে, ঐ ব্যালকনি থেকে তাজমহল দেখেছি। একবার বর্ষাকালে ঘন কালো মেঘের পর্দার সামনে শ্বেতপাথরে নির্মিত তাজমহলকে দেখে মনে হয়েছিল রীতিমত ঐশ্বরিক এক ইমারত।

আগ্রা শহরের বাদবাকি সব আমাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল এই দুই দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের পর। সেবারে আগ্রা ভ্রমণের পর, আমরা দিল্লী এবং কলকাতা হয়ে ফিরে এলাম ঢাকায়।

সেই রতনপুরে

সেই বাল্যকাল থেকে এই কাল পর্যন্ত একটি জায়গায় যেতে আমি কখনও ক্লান্তি বোধ করি না, আর সে জায়গাটির নাম হচ্ছে রতনপুর-আমার গ্রাম। ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলায় এর অবস্থান। আমার বাবার জন্ম এই গ্রামে । খুব সম্ভবত আমার দাদারও। আমাদের রতনপুর যাওয়া সীমিত ছিল বছরে একবার কিংবা, বাবার ভাষায় ”পরান পুড়লে”, দুবার পর্যন্ত। যে বছর দু’বার যাওয়া হতো, সে বছর প্রথমবার আমরা যেতাম ভরা বর্ষায় আর দ্বিতীয়বার হেমন্তে। আমার দেশি ভাষায় ’আঘুন মাসে’।

ঐ আঘুন মাস বা অগ্রহায়ণ মাসেই গোলা ভরে ধান উঠতো। আমাদের আদি বাসস্থান, যাকে দালান নামে সম্বোধন করা হয়, তার সামনে, পুব দিকে মাটির সযতেœ লেপা উঠোন পেরিয়ে ছিল টিন আর তরজার বেড়া দিয়ে তৈরি বেশ বড়সড় একটি ঘর যাকে বৈঠকখানা কিংবা বাহির বাড়ি বলা হয়ে থাকে। তারও পুবে ছিল আমাদের পাকা ঘাট-বাঁধানো পুকুর। সেই পুকুরে অনেক বড় বড় মাছ ছিল। আমাদের যাবার দিন ঠিক হলেই আমার সেজদা , আমাদের জ্যাঠাতো ভাই, তিন-চারটা বড় রুই, কাতলা কিংবা আড় মাছ ধরে ভাসমান বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রাখতেন। সারাদিন ঐ মাছ পুকুরময় ভেসে বেড়াতো। গ্রামে গেলে পরে, নিত্যই আমাদের সাথে দেখা করতে অনেক মানুষ আসতো। তাদের কেউ কেউ আসতো নিমন্ত্রিত হয়ে। অতএব, দুপুরে কিংবা রাতে তাদের জন্য পাত পড়তো আমাদের বড় জেঠিমার দাওয়ায়। এমনকি অনাহূত হয়েও যারা আসতো, তাদেরকে না খেয়ে ফিরে যেতে দেওয়া হতো না-এই ছিল আমাদের বাড়ির নিয়ম।

যে পাঁচ-ছয় দিন রতনপুরে থাকতাম, প্রচন্ডভাবেই থাকতাম। ঐ পাঁচ-ছয় দিন সবারই পড়াশোনা মাফ। ঢাকা থেকে আমরা ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনের সরঞ্জাম সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। রতনপুরে যুক্ত হতো ডান্ডাগুলি, গোল্লাছুট, সাতচারা আরও কত কি! তবে শহর থেকে যাই নিয়ে যাই না কেন রতনপুরে, শহুরে খোলশটা কিন্তু ফেলে রেখে যেতাম ঢাকাতেই। গ্রামে গিয়ে সেখানকার ভাষা, আদব-কায়দা, আচার-অচরণ ইত্যাদিতে নিজের অজান্তেই কেমন যেন মিশে যেতাম আমরা সবাই। দিব্যি তাদের ভাষায় কথা বলতাম। তারাও চেষ্টা করতো প্রমিত ভাষায় কথা বলতে। ভুল হলে আমরা হাসতাম। আমাদের ভুল হলে ওরা হাসতো।

সেই সময় আমাদের বড় পছন্দের একটা সময় কাটানোর পন্থা ছিল ধানক্ষেতের আলপথ ধরে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ানো। কোন কোন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে আমি আর আমার ছোট বোন ঝুনু ঐ আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে যেতাম। দূরে ধানক্ষেতের মাঝে কোন বিল কি জলার ধারে বসে নানা গল্প করতাম। সবুজের মাঝে বসে সবুজে হারিয়ে যেতাম আমরা। নিস্তব্ধ বিকেলে সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। ঘাসের ডগা চিবুতে চিবুতে নীরব নিসর্গে কোথায় হারিয়ে যেতাম তা কে জানে?

সেই সব দিনে ঢাকা থেকে আমাদের গ্রামে যাবার পথ ছিল দুর্গম। আজকের মতো রাস্তাঘাট তখনও হয়নি। বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময় এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে হেঁটে যেতে হতো। বর্ষাকালে খালের মধ্য দিয়ে নৌকায় তরতরিয়ে যাওয়া যেত গ্রাম থেকে গ্রামে। তখন বাড়িগুলো যেন একেকটা দ্বীপের মতো হয়ে যেতো আর চারদিকে থৈ থৈ করতো পানি। অতএব, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি নৌকা করে যেতে হতো। শরৎ-হেমন্তে রতনপুরে আমরা দিব্যি মাইলের পর মাইল হেঁটে আমার বড় ভাইদের সাথে বিভিন্ন বাজারে যেতাম। আজকের গ্রামের বাজারের থেকে চরিত্রগতভাবে ভিন্ন ছিল সেগুলো। নানারকম চিত্তসুখকর জিনিসের দোকান ছিল দুর্লভ। তবে, এইসব বাজারের প্রত্যেকটিতেই অন্ততপক্ষে একটি মনোহরী দোকান থাকতো। যেখানে মুড়ি, মুড়কি, মোয়া ছাড়াও মুরালী কিংবা কটকটি এইসব কিনতে পাওয়া যেতো। বড় ভাইদের কল্যাণে আমাকে কখনও খালি হাতে ফিরতে হয়নি বাজার থেকে।
বিকেল বেলা আমাদের বাড়ির সামনের মাটি লেপা নিকোন উঠোনে গ্রামের লোকজন আসতো ভিড় করে বাবার সাথে দেখা করতে। বাবা সেই আসরের মধ্যমণি হয়ে একটি চেয়ারে বসে হুঁকো টানতে টানতে জমিয়ে আড্ডা দিতেন। সেই সময় হয়তো আমরা ফুটবল নিয়ে নাড়া পোড়ানো মাটিতে নেমে পড়েছি। ধান কাটার পরে ধান গাছের শুকনো অবশিষ্টাংশকে নাড়া বলা হয়ে থাকে। এই নাড়ায় আগুন দিলে পুড়ে গিয়ে যে ছাই হয় সেটি সারের কাজ করে। অতএব, নাড়া পোড়ানো খুবই প্রচলিত ছিল তখনকার দিনে।

আমি ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারি। মনে আছে গ্রামের বালক-বালিকাদেরকে চমৎকৃত করে আমি আমাদের পুকুরে একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা সাঁতার কেটে গেছি। এইরকম করতে করতে এক-এক দিন পুকুরের মাঝ দিয়ে একশবার এপার ওপার করা হয়ে যেতো। যখন সাঁতার থামিয়ে ওপরে উঠতাম, তখন সকলে হাততালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দন জানাতো। স্বভাবতই, খুব ভালো লাগতো আমার।

যেহেতু, বাল্যকাল থেকেই আমার সৌভাগ্য হয়েছে বাংলাদেশের সর্বত্র ঘুরে বেড়াবার সেহেতু, অনেক ঘাসের ডগায় অজ¯্র শিশিরবিন্দু দেখে বড় হয়েছি আমি। আর তাই, সেই বাল্যকালেই সুজলা-সুফলা, শ্যামল বাংলার নিসর্গের প্রতি যে ভালবাসার সৃষ্টি হয়েছিল আমার মনে, আজ পরিণত বয়সে এসেও তা একই রকম রয়ে গেছে।